September 15, 2019, 10:35 am

শিরোনাম :
মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধই আমার মূল লক্ষ; ফরিদ উদ্দিন মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজ ঘোষণার দাবি জাতীয় সংসদে উত্থাপন কলাপাড়ায় নদীতে পড়ে বার্জ শ্রমিক নিখোঁজ শিবগঞ্জে গুজিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন তালায় রুগ্ন গাভী জবাই : মাংস ব্যবসায়ীকে জরিমানা ঝিনাইদহের শৈলকুপায় প্রাথমিক শিক্ষকদের মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান পিযুষসহ আটক ৪, অস্ত্র, গুলি, ইয়াবা উদ্ধার কুড়িগ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনের গল্প নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক বীরগাথা শীর্ষক ডকুমেন্টরী ইসলামে আশুরা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ দিন রাজারহাটে অটো রিক্সার ধাক্কায় মোটর সাইকেল আরোহির মৃত্যু

বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীর জীবনের চেয়ে অর্থই মুখ্য

Spread the love

বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীর জীবনের চেয়ে অর্থই মুখ্য

ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

দেশের অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের কাছে রোগীর জীবনের চেয়ে অর্থই মূখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানা কৌশলে দুর্বল অবকাঠামো দিয়ে রোগী ভর্তি ও চিকিৎসা প্রদানের অভিনয় করে রোগীর কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। ফলে হুমকির মুখে পড়ছে দেশের চিকিৎসাসেবা। বিপন্ন হয়ে পড়ছে রোগীর জীবন। অভিযোগ উঠেছে, পর্যাপ্ত সার্বক্ষণিক চিকিৎসকের অভাবে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা চরমভাবে ব্যাহত হয়। অথচ সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসকের বড় অংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেন। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যাপক হারে অনুমোদন পাওয়ার পর শর্ত ভঙ্গ, অব্যবস্থাপনা ও ভুল চিকিৎসা প্রদানের অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি ওসব অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত একের পর এক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে জেল-জরিমানা করছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, অধিকাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সার্বক্ষণিক বা বেশিক্ষণ অবস্থান করে না। রোগ ও রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকদের ডেকে নেয়া হয়। ফলে অনেক বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সঙ্কটাপন্ন রোগীর প্রয়োজনে সঠিক সময়ে চিকিৎসক পাওয়া যায় না। এমন অবস্থায় চিকিৎসক আসার আগেই অনেক রোগীর মৃত্যু ঘটে। বেসরকারি ক্লিনিকগুলো মূলত সরকারি খাতের চিকিৎসকদের ওপর নিভরশীল। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিকের অনুমোদন পেতে মোট ৩১টি শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু প্রদত্ত আবেদনপত্রের ৩১টি তথ্য কাগজেকলমে ঠিক থাকলেও মালিকরা অধিকাংশ শর্তই পূরণ করেন না। আর আইসিইউ নিয়ে ফাঁকিবাজি ও বাণিজ্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অনেক হাসপাতাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) নামে উচ্চ চিকিৎসা ফি আদায় করছে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা ও উপকরণ ছাড়াই চলছে রাজধানীর অনেক বেসরকারি হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ চিকিৎসক ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করেন। আর সরকারি খাতের ৮০ শতাংশ চিকিৎসকও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গবেষকদের মতে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সর্বক্ষণিক চিকিৎসক রাখাই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ক্লিনিকগুলো মূলত সরকারি খাতের চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল। দেশের বিদ্যমান আইনে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা নিজের প্রতিষ্ঠানের বাইরে রোগী দেখতে পারবেন না। কিন্তু অনেক বেসরকারি ক্লিনিকেই ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগী দেখেন। পাশাপাশি ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ লাভের সম্পর্ক গড়ে উঠছে। ওষুধ কোম্পানিগুলো চিকিৎসকদের একটি অংশকে দিয়ে ব্যবস্থাপত্রে নিজেদের ওষুধ লিখিয়ে নেয়। আর বাধ্য হয়ে ওসব ওষুধ কিনতে হয় বলে রোগীর খরচের বোঝা বেড়ে যায়। চিকিৎসাসেবায় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জনবলের স্বল্পতা একটি বড় সমস্যা। দিনে চিকিৎসকস্বল্পতা বেশি প্রকট।

সূত্র আরো জানায়, স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকের অনুমোদন পেতে আবেদনপত্রে চাওয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল, ক্লিনিকের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর, মোট শয্যা সংখ্যা, হাসপাতাল, ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার তারিখ, প্রতিষ্ঠানের ধরন, মালিক/মালিকদের ছবি-নাম ও পূর্ণ ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর, মালিক/মালিকরা সরকারি চাকরি করলে তার বিবরণ এবং না করলে অঙ্গীকারনামা, যৌথ মালিকানার ক্ষেত্রে চুক্তিপত্রের সত্যায়িত কপি, আমমোক্তারনামার সত্যায়িত কপি, বাড়িভাড়া চুক্তিপত্রের সত্যায়িত কপি এবং নিজ বাড়ি হলে দলিলের সত্যায়িত কপি, ট্রেড লাইসেন্সের সত্যায়িত কপি, রোগীদের জন্য বিভাগভিত্তিক সেবা প্রদানের তালিকা (বিবরণ আলাদাভাবে সংযুক্ত করতে হবে), প্রতিষ্ঠানে যে সমস্ত অস্ত্রোপচার করা হবে তার তালিকা (বিবরণ আলাদাভাবে সংযুক্ত করতে হবে), প্রতিষ্ঠানে মোট মেঝের (ফ্লোর) পরিমাণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একক কেবিন সংখ্যা, শীতাতপবিহীন একক কেবিন সংখ্যা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডবল কেবিন সংখ্যা, শীতাতপবিহীন ডবল কেবিন সংখ্যা, সাধারণ ওয়ার্ডের শয্যা সংখ্যা, রোগীদের জন্য প্রদত্ত মেঝের পরিমাণ, কেবিন ও ওয়ার্ডের প্রকৃত মেঝের পরিমাণ, অস্ত্রোপচার কক্ষ-অস্ত্রোপচার কক্ষের একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা (বিবরণ আলাদাভাবে সংযুক্ত করতে হবে) ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কী না, প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা (বিবরণ আলাদাভাবে সংযুক্ত করতে হবে), প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির তালিকা (বিবরণ আলাদাভাবে সংযুক্ত করতে হবে), বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নাম, ঠিকানা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্রের সত্যায়িত কপি ও সম্মতিপত্র, সর্বক্ষণিক চিকিৎসকদের ছবি, নাম, ঠিকানা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্রের সত্যায়িত কপি এবং নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র ও সরকারি চাকরি না করার অঙ্গীকারনামা, সর্বক্ষণিক নার্সদের ছবি, নাম, ঠিকানা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্রের সত্যায়িত কপি এবং নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র ও সরকারী চাকরি না করার অঙ্গীকারনামা, সর্বক্ষণিক ঝাড়ুদার, ওয়ার্ড বয়, আয়ার ছবি, নাম, ঠিকানা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যায়িত কপি এবং নিয়োগপত্র, যোগদানপত্রের কপি, সর্বক্ষণিক অন্য কর্মচারীদের ছবি, নাম, ঠিকানা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যায়িত কপি এবং নিয়োগপত্র, যোগদানপত্রের কপি, প্রতিষ্ঠানে প্রদত্ত অন্যান্য সুবিধাদি (বিবরণ আলাদাভাবে সংযুক্ত করতে হবে), পানি সরবরাহ, পয়ঃপ্রণালী, জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা (জেনারেটর), আলো-বাতাস ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় আছে কী না? প্যাথলজি পরীক্ষার সুযোগ আছে কী? কিন্তু প্রদত্ত আবেদনপত্রের ৩১টি তথ্য কাগজেকলমে ঠিক থাকলেও বাস্তবে দেখা যায় না।

এদিকে অনেক হাসপাতালই ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) নামে উচ্চ চিকিৎসা ফি আদায় করছে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা ও উপকরণ ছাড়াই চলছে রাজধানীর কিছু সংখ্যক হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ)। অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মেডিক্যাল উপকরণ ও ওষুধের পরিমাণ দেখিয়ে বিল বাড়িয়ে দেয়া হয়। পর্যাপ্ত সংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রাখা হয় না। দু’তিনটি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা সব রোগের চিকিৎসা করানোর ব্যবসা চালানো হয়। অনেক হাসপাতালে আইসিইউর শতকরা ৭০ ভাগ শয্যার সঙ্গে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র নেই। শতকরা ৬০ ভাগ আইসিইউতে প্রতিটি শয্যার জন্য একজন করে সেবিকা নেই। আর যেসব সেবিকা আছেন, তাদের শতকরা ৬৪ ভাগ সেবিকার প্রশিক্ষণ নেই। ফলে মোটা অংকের টাকা খরচ করেও কিছু হাসপাতালে সেবা পাওয়া যায় না। তাছাড়া উচ্চ ফি ও সীমিত শয্যার কারণে অনেক দরিদ্র রোগী আইসিইউ সেবা নিতে পারে না।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, আইসিইউতে রোগীকে ওঠা-নামানো, কাত করাসহ বিভিন্ন অবস্থানে রাখার জন্য বিশেষায়িত শয্যার দরকার। প্রত্যেক রোগীর জন্য পৃথক ভেন্টিলেটর (কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র) ও কার্ডিয়াক মনিটর (হৃদযন্ত্রের অবস্থা, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা, কার্বন-ডাই অক্সাইড নির্গমনের মাত্রা, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি, রক্তচাপ পরিমাপক), ইনফিউশন পাম্প (স্যালাইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাত্রা নির্ধারণ যন্ত্র) দরকার। আইসিইউতে শক মেডিশন (হৃদযন্ত্রের গতি হঠাৎ থেমে গেলে তা চালু করার যন্ত্র), সিরিঞ্জ পাম্প (শরীরে ইনজেকশনের মাধ্যমে যে ওষুধ প্রবেশ করানো হয় তার মাত্রা নির্ধারণের যন্ত্র), ব্লাড ওয়ার্মার (রক্ত দেয়ার আগে শরীরের ভেতরকার তাপমাত্রা সমান করার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র) থাকবে। পাশাপাশি কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এবিজি মেশিন (মুমূর্ষু রোগীর রক্তে বিভিন্ন উপাদানের মাত্রা নির্ধারণ) থাকতে হবে। পাশাপাশি জরুরি পরীক্ষার জন্য আইসিইউসির সঙ্গে একটি পরীক্ষাগার থাকাও আবশ্যক। মূলত জটিল রোগের চিকিৎসায় ও জরুরি প্রয়োজনে আইসিইউর সেবা নিতে হয়। চিকিৎসকরাও ওই সেবার কথা ব্যবস্থাপনাপত্রে লেখেন। কিন্তু খরচ করেও বেসরকারি কিছু হাসপাতালে সেবা পাওয়া যায় না। বর্তমানে আইসিইউ একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজধানীর নামী হাসপাতালগুলোতে আইসিইউর দৈনিক খরচ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং মাঝারি হাসপাতালগুলোতে খরচ ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বলা হলেও রোগীদের তার দ্বিগুণ টাকা দিতে হয়।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ আবুল কালাম আজাদ জানান, দেশের প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজসহ জেলা সদর হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণন কেন্দ্র (আইসিইউ) স্থাপনের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। জেলা সদর পর্যায়ের হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা উদ্যোগী হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিটি হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন করা যাবে। সেজন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহে সার্বিক সহযোগিতা করবে সরকার। এ উদ্যোগ সফল হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমে যাবে। উচ্চ ফি নেয়ার প্রতিযোগিতাও বেশি থাকবে না। তাছাড়া বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার নীতিমালা খুব শিগগিরই চূড়ান্ত হবে। আর অনুমোদনের শর্ত ভঙ্গকারী এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রাধান্য দিতে গিয়ে ভুল চিকিৎসা প্রদানকারী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

Facebook Comments
Share Button

      এ ক্যাটাগরীর আরও সংবাদ