June 14, 2019, 4:59 pm

‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ ট্রেন উদ্বোধন, স্টেশনের নতুন নামকরণ

Spread the love

‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ ট্রেন উদ্বোধন, স্টেশনের নতুন নামকরণ

ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

দেশের সর্বোচ্চ দূরত্বের রেলপথে চালু হলো ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ নামে নতুন নন-স্টপ (বিরতিহীন) ট্রেন সার্ভিস। বহুল প্রত্যাশিত এ ট্রেন সার্ভিস চালু হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে পঞ্চগড়বাসী। গতকাল শনিবার দুপুর ১টার দিকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। দুপুর ১টা ৩০মিনিটে নতুন এ আন্তঃনগর ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ ট্রেন যাত্রাদিয়ে শুরু হয় বিরতিহীন পঞ্চগড় টু ঢাকা রেলপথে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পঞ্চগড়বাসীর বহুল প্রত্যাশিত ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে ও সবুজ পতাকার সংকেত দেখিয়ে উদ্বোধন ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে স্টেশনের নতুন নাম ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম রেলওয়ে স্টেশন পঞ্চগড়’ ঘোষণা করেন। পঞ্চগড়ে এর নামফলক উদ্বোধন করেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। এ উপলক্ষে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম রেলওয়ে স্টেশন পঞ্চগড় চত্বরে ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করে রেলওয়ে বিভাগ। এসময় ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন, পুলিশ সুপার গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের জিএম খন্দকার শহীদুল ইসলাম প্রমুখ। পরে রেলপথ মন্ত্রী নন-স্টপ (বিরতিহীন) ট্রেন ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ করেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।

এদিকে, পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় মেট্রোরেল চালুর পর বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চালুর পরিকল্পনাও জানান । বাংলাদেশ এখনও ডিজেলচালিত ট্রেন চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার মেট্রোরেলের মাধ্যমে দেশের প্রথম বিদ্যুৎচালিত ট্রেনের ব্যবহার শুরু হবে। এরপর দূরপাল্লায়ও বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চালুর কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা মেট্রোরেল যেমন চালু করতে যাচ্ছি, সেইসাথে আমরা বিদ্যুৎ চালিত ট্রেন, যা একান্তভাবে পরিবেশ বান্ধব, সেই বিদ্যুৎ চালিত ট্রেনও চালু করব। আমরা সেভাবে কাজ করে যাচ্ছি। তেলচালিত ট্রেনে দূষণের মাত্রা বেশি হওয়ায় উন্নত দেশগুলো এমনকি অনেক উন্নয়নশীল দেশেও তেলের ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদ্যুৎচালিত ট্রেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে একসময় হাহাকার ছিল। আজকে প্রায় ৯৩ ভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিতে পারছি। যেসব মেগা প্রকল্প এবং যেসমস্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো নির্মিত হচ্ছে, তাতে আমাদের বিদ্যুতের কোনো অভাব থাকবে না। রেলের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যত দিন যাচ্ছে রেল আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। মানুষ এখন রেলে বেশি চড়তে চায়। চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের আরও বেশি যাত্রীবাহী কোচ দরকার। কাজেই আরও বেশি কোচ আমাদের কিনতে হবে। শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় গত সাড়ে ১০ বছরের রেলের উন্নয়নের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কাজেই এভাবে আমরা রেলের উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছি। শেখ হাসিনা বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমেব একটা দেশের আর্থ-সামাজক উন্নতি সম্ভব। আর সেদিকে লক্ষ্য রেখেই রেল, সড়ক, আকাশ, নৌপথ সবদিকেই আমরা দৃষ্টি দিয়েছি এবং উন্নয়ন করে যাচ্ছি। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক, লাভজনক নয় বলে বিএনপি সরকারের আমলে পুরো রেল যোগাযোগটাই বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। অনেকগুলো ট্রেন ও লাইনগুলো বন্ধ করে দেয়। রেলটাকে সম্পূর্ণভাবে তারা ধ্বংস করতে চেয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর আলাদা মন্ত্রণালয় গড়ে তুলে সার্বিকভাবে রেলকে যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, রেলের উন্নয়নে গত ১০ বছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ৬৪টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং আরও ৪৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এসময়ে ৩৭১ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। ২৪৮ কিলোমিটার মিটারগেইজ লাইন ডুয়েল গেইজে রূপান্তর করা হয়েছে। ১০০০ কিলোমিটারের বেশি পুরনো রেলপথ মেরামত করা হয়েছে। ৬২টি বন্ধ রেলস্টেশন চালু, ৯৩টি নতুন স্টেশন ভবন নির্মাণ, ৩২৯টি নতুন রেলসেতু নির্মাণ, ৬৫৮টি রেলসেতু সংস্কারের কথাও জানানো হয় অনুষ্ঠানে। এই সময়ে ৪৬টি নতুন লোকোমেটিভ কেনা ছাড়াও ৩২০টি যাত্রীবাহী কোচ কেনা হয়েছে এবং আরও ৬৫০টি কেনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসময়ে মালবাহী ওয়াগন কেনা হয়েছে ৫১৬টি। এছাড়া সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের মধ্যে রেলে দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এগুলো হলো- পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প এবং দোহাজারী-কক্সবাজার-রামু-ঘুনধুম রেল লাইন স্থাপন প্রকল্প। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর বাংলাদেশ ও ভারতের ভারতের মধ্যে যেসব রেল সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে সেগুলো চালু করা হচ্ছে বলে জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গেও বাংলাদেশ যেন সংযুক্ত হয় সে ব্যবস্থাটাও আমরা নিয়েছি। রেলের ডিজিটাইজেশন, দেশের দক্ষিণবঙ্গে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপন, ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্যুরিস্ট ট্রেন চালু করা, বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে যমুনার উপর একটি রেলসেতু নির্মাণের উদোগসহ নানা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ঢাকা-পঞ্চগড় রেলপথে প্রথম বারের মতো দ্রুত গতির পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনটি পাঁচশ ৯৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে ১০ ঘণ্টায়। ট্রেনটি প্রতিদিন ১২টা ১৫ মিনিটে পঞ্চগড় থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গিয়ে রাত ১০টা ৩৫মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে। আবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে পঞ্চগড় পৌঁছাবে। যাত্রাপথে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পাবর্তীপুর ও ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে থামবে। ঢাকা থেকে আসার পথেও এসব স্টেশনে থামবে। এ ট্রেনটিতে আধুনিক সুযোগ সুবিধা থাকলেও ভাড়া একতা ও দ্রুতযানের সমান রাখা হয়েছে। শোভন চেয়ার ৫৫০ টাকা, এসি চেয়ার এক হাজার ৩৫ টাকা, এসি সিট এক হাজার ২৬০ টাকা এবং এসি বার্থ এক হাজার ৮৯২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রেনটির ৩০ শতাংশ আসন পঞ্চগড়ের জন্য, ৩০ শতাংশ দিনাজপুর, ২৫ শতাংশ ঠাকুরগাঁও এবং ১৫ শতাংশ পার্বতীপুরের জন্য নির্ধারিত। সব মিলে ১২টি কোচ নিয়ে প্রায় এক হাজার যাত্রী পরিবহন করবে ট্রেনটি। ট্রেনটিতে ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন কোচগুলো যুক্ত করা হয়েছে। স্বল্প বিরতির পঞ্চগড় এক্সপ্রেস উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতার আগ থেকেই পরিচিত হয়ে ওঠা পঞ্চগড় রেলওয়ে স্টেশনের নামটিও বদল করা হয়েছে। পঞ্চগড় রেলওয়ে স্টেশনের নাম ফলক মুছে নতুন নাম দেওয়া হয়েছে। স্টেশনটি ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম রেলওয়ে স্টেশন’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৬ নং সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা ছিলেন।

Facebook Comments
Share Button

      এ ক্যাটাগরীর আরও সংবাদ