November 11, 2019, 10:43 pm

শিরোনাম :
সাঘাটায় স্কুল ছাত্রী অপহরণ করে ৭ দিন যাবৎ ধর্ষণ : ধর্ষক প্রিন্স মিয়া আটক পলাশবাড়ী পৌর শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নত করার দাবী ব্যাপক ভোগান্তিতে পৌরবাসী বোয়ালমারীতে দুই পক্ষের সংঘর্ষে চেয়ারম্যানসহ আহত ১০ ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে মোরেলগঞ্জে ব্যাপক ক্ষতি বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে আওয়ামীলীগ-যুবলীগের ৪৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালিত নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু গুরুদাসপুরে জলাবদ্ধতা !! হারিয়ে গেছে ৩০ গ্রামের মানুষের সুখ-শান্তি বেনা‌পোল কাস্টস হাউ‌জের গোপনীয় লকার ভে‌ঙ্গে স্বর্ণ, ডলার সহ মুল্যবান পন্য সামগ্রী চু‌রির অভিযোগ  শার্শায় আধিপত্য বিস্তার করতে বুলু বাহিনীর হামলা, দোকান পাট ভাংচুর ও লুট সহ- ৩ জন আহত শেষ হয়েছে পাহাড়ের মাসব্যাপী দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব
সিসিটিভির ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই গৃহকর্মীর ছবি

খুনিরা এলোপাতাড়ি কোপায় গলা কাটার পর

Spread the love

মোঃ রবিন চৌধুরী,ঢাকা জেলা প্রতিনিধিঃ

 

সিসিটিভির ক্যামেরায় ধরা পড়ে সেই গৃহকর্মীর ছবি

রাজধানীর ধানমণ্ডিতে শিল্পপতি মনির উদ্দিনের ফ্ল্যাটে তার শাশুড়ি আফরোজা বেগম ও গৃহকর্মী দিতিকে নৃশংসভাবে খুনের কাণ্ডটি ছিল পরিকল্পিত। প্রথমে হত্যা করা হয় গৃহকর্মীকে; পরে গৃহকর্ত্রীকে। নিহত দুজনেরই পেছন থেকে ফল কাটার ছুরি দিয়ে এক টানে গলা কেটে ফেলা হয়। এরপর মৃত্যু নিশ্চিত করতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপায় দুর্বৃত্তরা। এর পর এটি ডাকাতির ঘটনা হিসেবে সাজাতে খুনিরা আলমারি ভাঙে, এলোমেলো করে ঘরের মালামাল; নিয়ে যায় কয়েকটি মোবাইল ফোন, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান সামগ্রী।এ কিলিং মিশনে অংশ নেয় ‘ভাড়াটে কিলার’ গত শুক্রবার নিয়োগ পাওয়া আনুমানিক ২১ বছরের নতুন গৃহকর্মী ছাড়াও কয়েকজন। খুনের আগে ওই শিল্পপতির বাড়ির সামনে জড়ো হয় ওই গৃহকর্মীসহ খুনির দল। জোড়া খুনের পর ঠাণ্ডা মাথায় ফ্ল্যাট ও ভবন থেকে বেরিয়ে এলাকা ছাড়ে তারা। খুনের আগে-পরে কলকাঠি নাড়ে নিহত আফরোজা বেগমেরই পরিচিত কেউ। চাঞ্চল্যকর এ জোড়া খুনের কারণ সম্পর্কে গতকাল রাত পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তসংশ্লিষ্টরা।গতকাল ২ নভেম্বর ২০১৯শনিবার সন্ধ্যায় নিহত আফরোজা বেগমের ছোট মেয়ে অ্যাডভোকেট দিলরুবা সুলতানা রুবা বাদী হয়ে নতুন ওই গৃহকর্মীসহ ৭/৮ জনকে আসামি করে ধানমণ্ডি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। জোড়া খুনের মোটিভ ও হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে ধানমণ্ডি থানাপুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মাঠে নেমেছে। হত্যায় ব্যবহৃত হাতল ভাঙা একটি ছুরি জব্দ করা হয়েছে।গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শিল্পপতি মনির উদ্দিনের ধানমন্ডি ২৮ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর বাসার পঞ্চম তলায় খুন হন আফরোজা ও দিতি। লাশগুলোর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে গতকাল তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। তিন সদস্যের বোর্ড গঠন করে এদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। বোর্ডের প্রধান ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. সোহেল মাহমুদ জানান, নিহত দুজনের শরীরে ছুরিকাঘাতের একাধিক জখম রয়েছে। আফরোজা বেগমের গলা কাটা ছাড়াও পেটে, বুকে একাধিক ছুরিকাঘাত করা হয়। এর মধ্যে একটি আঘাত তার কিডনি ভেদ করে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান তিনি। অন্যদিকে গৃহকর্মী দিতির গলা কাটা ছাড়াও শরীরের এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয়। তবে গলা কাটার কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয় তার।ময়নাতদন্ত বোর্ডের অপর দুই সদস্য প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও ডা. কবির সোহেল। ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. কবির সোহেল জানান, পরীক্ষার জন্য গৃহকর্ত্রীর ভিসেরা ও গৃহকর্মী দিতির হাই ভেজাইনাল টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। মৃত্যুর আগে দিতি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কিনা, পরীক্ষার পর তা জানা যাবে।এ জোড়া হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ধানম-ি থানার এসআই এনামুল হক বলেন, ধারণা করছি, এটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। এতে ওই বাসার নতুন এক গৃহকর্মী জড়িত। ওই বাসার আলমারি ও ড্রয়ার ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেলেও সচরাচর ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নেই। শুধু ডাকাতি করার জন্য দুজনকে একইভাবে গলা কেটে হত্যার বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায় বলে এ নিয়ে চলছে গভীর তদন্ত। শিল্পপতি মনির উদ্দিনের দেহরক্ষী বাচ্চু মিয়া, ওই বাড়ির দারোয়ান, কেয়ারটেকার, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি, পার্শ্ববর্তী পানদোকানিসহ ৭/৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ওই বাসার সিসিটিভির ফুটেজ ঘেঁটেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে জানান তিনি। বলেন, আমরা সম্ভাব্য সব কারণকে সামনে রেখে তদন্ত করে যাচ্ছি। প্রাথমিকভাবে পলাতক গৃহকর্মীকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একজন নারী ছুরি দিয়ে জবাই করে দুই নারীকে হত্যা করার বিষয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। হত্যায় ওই গৃহকর্মীর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা তা তাকে আটক করতে পারলে জানা যাবে।তদন্ত কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে বাচ্চু দাবি করেছেন, তিনি রাস্তায় ঘুড়ে বেড়ানো এক পান দোকানদারের মাধ্যমে পরিচিত হওয়া ওই তরুণীকে কাজের বুয়া হিসেবে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনিও তার পরিচয় ঠিকঠাক জানতেন না।তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এর পরও মেয়েটির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তার স্থায়ী ঠিকানা বের করা হয়েছে। সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পর থেকে সে বাড়িতেই যায়নি। রাজধানীর কোথাও আত্মগোপন করে আছে। আশা করছি, শিগগিরই তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।গতকাল শনিবার ধানম-ি ২৮ নম্বর রোডের লবেলিয়া অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে দেখা যায়, বাসার ভেতরে যে কক্ষ থেকে গৃহকর্মী দিতির লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল, সে ঘরের রক্ত পরিষ্কার করা হয়নি। কক্ষটি খুলতেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। রক্তে মাছি ভন ভন করছিল। সেই রুম দেখিয়ে নিহত আফরোজা বেগমের ছোট মেয়ের স্বামী তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক শিল্পপতি মনির উদ্দিন তারিম বলেন, দেখেন রক্তের মধ্যেই ঝাড়– পড়ে আছে। তার মানে মেয়েটি হয়তো ঝাড়– দিচ্ছিল, ওই সময় তাকে হয়তো ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তারপর খুনি ওই (শাশুড়ি) রুমে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে যে, আম্মা (আফরোজা বেগম) হয়তো খাটের ওপর শুয়ে বা বসে ছিলেন। ওই অবস্থায় তাকে ছুরি দিয়ে গলায় আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গেই রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয়ে প্রায় দুই/তিন ফিট দূরে গিয়ে পড়েছে। এরপর তাকে আরও আঘাত করে হত্যা নিশ্চিত করার পর টেনেহিঁচড়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে রাখা হয়। হত্যার পর খুনি তার (আফরোজা বেগম) হাত থেকে স্বর্ণের বালা, কানের দুল ও হাতের আংটি খুলে নিয়ে গেছে। হত্যার এক/দুদিন আগে আমার শাশুড়ি ব্যাংক থেকে দেড় লাখ টাকা তুলে রেখেছিলেন আলমারিতে। তা ছাড়া আগে থেকেই আরও টাকা এবং বেশকিছু স্বর্ণালঙ্কারও ছিল ড্রয়িংরুমে। সেসব তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেছে।তিনি আরও বলেন, যে বাচ্চুর মাধ্যমে এ কাজের বুয়া এসেছিল, সেই বাচ্চু দীর্ঘদিন ধরেই তাদের সঙ্গে থাকেন। হত্যাকা-ের দুদিন আগে বাচ্চুকে ধমক দিয়েছিলেন তার শাশুড়ি। বাচ্চুই এ কাজের মেয়েকে নিয়ে এসেছিল। ঘটনার দিন বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আমার বাসায় সবাই ছিলাম। ওই সময় মেয়েটিকে নিয়ে বাচ্চু পাঁচতলায় আমাদের ফ্ল্যাটে আসে। দরজা খোলা অবস্থায় বাইরে দাঁড়িয়েই তার সঙ্গে কিছু কথা বলা হয়। তারপর বাচ্চুর সঙ্গে মেয়েটিকে চতুর্থ তলায় পাঠানো হয়, যাতে সে বাসা ও বাসার কাজ সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে। কিছুক্ষণ পর আম্মা যান নিচতলায়। কিছু সময় পর আমার স্ত্রী (দিলরুবা সুলতানা) ফোন করে কিছুক্ষণ কথা বলেন। তারপর আবার পাঁচ মিনিট পর ফোন করলে তা বন্ধ পেয়ে ছোট কাজের ছেলে রিয়াজকে পাঠানো হয়। সে নিচে গিয়ে দেখতে পায়, তাদের রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে।মনির উদ্দিন জানান, তার শাশুড়ি আফরোজা বেগম লিভার সিরোসিসের রোগী ছিলেন। পাশাপাশি ডায়াবেটিসেও আক্রান্ত ছিলেন। তাই সারাক্ষণ ঘরেই থাকতেন। তার কোনো শত্রু আছে বলে জানা নেই। দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।গতকাল শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ধানমন্ডির- ১৫ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর ওই ভবন পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। দলের সদস্য শরিফ আহম্মেদ বলেন, আমরা আলামত সংগ্রহ করতে এসেছি। এ ছাড়া ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছি।তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার করা সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এ হত্যার সঙ্গে নতুন গৃহকর্মীর সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী ১ নভেম্বর ২০১৯শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ওই নারী কাজের বুয়ার বেশে বাসায় ঢুকেছিলেন ধানমন্ডির- ২৮ নম্বর রোডের ২১ নম্বর লবেলিয়া অ্যাপার্টমেন্টের পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে। সঙ্গে ছিলেন গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগমের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কেয়ারটেকার বাচ্চু। আধা ঘণ্টা পর বাচ্চু নতুন গৃহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়িতে করে পঞ্চম তলার ফ্ল্যাট থেকে চতুর্থ তলার আফরোজা বেগমের ফ্ল্যাটে ঢোকেন। বিকাল সোয়া ৪টার দিকে বাচ্চু চতুর্থ তলার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যান। এ সময় ফ্ল্যাটের দরজা দিয়ে পুরনো গৃহকর্মী দিতিকে বের হয়ে আবার ঢুকতে দেখা গেছে। সন্ধ্যা ৫টা ৩২ মিনিটে ওই নতুন গৃহকর্মী ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তৃতীয় তলায় নামেন। এরপর তিনি লিফটে ওঠেন । এ সময় লিফটের সামনে দাঁড়ানো অবস্থায় ওই নারীর দুই পায়ের স্যান্ডেলে রক্ত লেগে থাকতে দেখা যায়। ওই নারী লিফটে করে নিচে নেমে যান।

প্রাইভেট ডিটেকটিভ/৩নভেম্বর ২০১৯/ইকবাল

 

Facebook Comments
Share Button

      এ ক্যাটাগরীর আরও সংবাদ